Home
Published: 2017-08-24 12:04:00

নিউজ আগামীঃ

প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ষণকে সবচেয়ে বড় এবং ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।বর্তমানে বাংলাদেশে ধর্ষণের হার বেড়েই চলেছে। পত্রিকার পাতায় এমন কোনোদিন নেই যে ধর্ষণের খবর আসে না।পত্রিকার খবর ছাড়াও দেশের আনাচেকানাচে যে কত ধর্ষণ হয় প্রতিনিয়ত তার হিসেব নেই।দিন দিন শিক্ষার হার বাড়ছে কিন্তু নৈতিক ও মানসিক মূল্যবোধের অবনতি ঘটছে।মানুষরূপী জানোয়ারদের হাত থেকে বাঁচতে পারছে না আট মাসের কন্যা শিশু থেকে শুরু করে সত্তুর বছরের বৃদ্ধা পর্যন্ত।ধর্ষণকারী শুধু ধর্ষণ করে থেমে থাকেনা তারা ধর্ষণের ভিডিও করে ইন্টারনেটে আপলোড করে দেয়।এতে করে অনেকেই বেছে নিতে হয় আত্নহত্যার পথ।ভিকটিমের পরিবার যখন বিচার চাইতে যায় তখন সমাজের কাছে হেয় হতে হয় প্রতিনিয়ত যা বিচার ব্যবস্থাকে করছে প্রশ্নের সম্মুখীন, আর তার সাথে সাথে ভিকটিমের পরবর্তী জীবন।দ্রুত এই সমস্যা সমাধান করা না হলে জাতির দুর্দিন খুবই সন্নিকেটে।

সাধারণত ধর্ষণ বলতে বুঝায়,নারী বা পুরুষ যে কোনো একজনের অমতে জোরপূর্বক যৌনসম্পর্ক স্থাপন করাকে।

পেনাল কোড ১৮৬০,ধারা ৩৭৫ অনুসারে একজন পুরুষকে ধর্ষণকারী হিসেবে গণ্য করা হবে যদি নিচের যেকোনো একটি পরিস্থিতিতে সে যৌন সম্পর্ক করে-

      # মেয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে

      # মেয়ের অনুমতি ছাড়া

      # সম্মতির সাথে,কিন্তু মৃত্যুভয়ে বা আঘাত দেওয়ার কারণে সম্মতি নিয়ে

      # সম্মতিতে, যখন মেয়েটিকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ছেলেটি সম্মতি আদায় করে,ছেলেটি জানে সে মেয়েটিকে বিয়ে করবে না

      # তার সম্মতি বা সম্মতি ছাড়া যখন ভিকটিমের বয়স ১৪ বছরের নিচে হয়।

ধর্ষণের রয়েছে বিভিন্ন কারণ। আমাদের সমাজে ধর্ষণের মূল কারণ হিসেবে নারীর পোশাককেই দায়ী করা হয়।কিন্তু বোরখা পরা,হিজাব পরা এমনকি আট মাসের শিশুটি যখন ধর্ষিত হয় তখন এ ঘটনাগুলোকে আমরা কি বলতে পারি?আসলে পোশাক নয়,পুরুষের দৃষটিভঙ্গি ও বিকৃত মানসিকতাই ধর্ষণের কারণ।তাছাড়া সঠিক বিচারের অভাবও ধর্ষণ বাড়ার কারণ।আইনের ফাকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায় এক একজন মানুষরূপী জানোয়ার। তাছাড়া যেভাবে ধর্ষণের বিচার পদ্ধতি কার্যকর করা হয় তাতে একজন নারীকে একবার নয় বারবার ধর্ষণের সম্মুখীন হতে হয়।বিচারব্যবস্থা ও পুরুষের দৃষটিভঙ্গির পরিবর্তন ই পারে ধর্ষণরোধ করতে।

দৈনিক সমকাল এর আকার্ইভ থেকে সংগৃহীত একটি গ্রন্থনাতে আইনে ধর্ষণের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে :

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধনী-২০০৩) ধারা ৯-এর ১-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে :যদি কোনো পুরুষ বিবাহবন্ধন ছাড়া ১৬ বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তার সম্মতি আদায় করে অথবা ১৬ বছরের কম বয়সের কোনো নারীর সঙ্গে তার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহলে তিনি ওই নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবে।ধর্ষণকারীর জরিমানা ও শাস্তিনারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০(সংশোধনী-২০০৩)-এর ধারা ৯-তে বলা হয়েছে_ ১. যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।২. যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা ওই ধর্ষণ-পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।৩. যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।৪. যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। এ ছাড়া যদি কেউ ধর্ষণের চেষ্টা করেন তাহলে ওই ব্যক্তি অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।৫. যদি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন কোনো নারী ধর্ষিত হন, তাহলে যাদের হেফাজতে থাকাকালীন ওই রূপ ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে, সেই ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা ধর্ষিত নারীর হেফাজতের জন্য সরাসরি দায়ী ছিলেন, তিনি বা তারা প্রত্যেকে ভিন্নরূপ প্রমাণিত না হলে হেফাজতের ব্যর্থতার জন্য অনধিক ১০ বছরের কিন্তু অনূ্যন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন।আইনি সহায়তা নির্যাতনের শিকার মেয়েটি সবচেয়ে কাছের থানা ও পুলিশের সহায়তা পাওয়ার অধিকারী। থানায় এজাহার নিতে না চাইলে নির্যাতনের শিকার মেয়েটির অভিভাবক কিংবা নির্যাতিত মেয়েটি নিজে বাদী হয়ে আদালতে নালিশি মামলা করতে পারেন। জেলা জজের আওতায় প্রতিটি জেলায় আইন সহায়তা কেন্দ্র রয়েছে, সেখানে আবেদন করলে আর্থিক অথবা আইনজীবীর সহায়তা পেতে পারেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের কাছে আবেদন করে আইনি সহায়তা নিতে পারেন। থানা ও হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে আইনগত সহায়তা ও চিকিৎসা পেতে পারেন। তেজগাঁও থানায় ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারেও সহায়তা পেতে পারে।

ধর্ষণ প্রতিরোধে করণীয়:

# ধর্ষণ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে সরকার।অপরাধীদের যদি কঠোরতম শাস্তি দেয়া যায় তবে এ ঘটনা কমার পাশাপাশি বন্ধও হতে পারে।

#ধর্ষণের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে দ্রুত। এতে করে অন্যরা এই অপরাধ থেকে দূরে থাকবে।

#সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

#নারীদের নিজেদের তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

#বাবা-মাকে শিশু ধর্ষণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।শিশু ধর্ষণ ও শিশু মলেস্টেষন যে কাছের মানুষের মাধ্যমে হতে পারে সে সম্পর্কে বাবা-মাকে সচেতন হতে হবে।

# স্কুল,কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে।

#ছেলে সন্তানকে ছোটবেলা থেকে "না"এর গুরুত্ত বোঝাতে হবে।যেকোনো সম্পর্কে একে অপরের সম্মতির  প্রতি শ্রদ্ধা করা শেখাতে হবে।

#পোশাক যার যার ব্যক্তিস্বাধীনতা।ধর্ষণের কারণ কখনোই পোশাক হতে পারে না।এ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

#একটি মেয়ে শুধু তার পরিবারের দায়িত্ব নয়,সমাজেরও।ধর্ষণ প্রতিরোধে ছেলেদের গঠনমূলক দ্বায়িত্ব পালন করতে হবে।

#মেয়েরা ঘর থেকে বের হবে যখন তখন তার সচেতন থাকতে হবে এবং কিছু কাছের মানুষের কন্টাক্ট নম্বর কাছে রাখতে হবে।

#আত্নবিশ্বাস সব সমস্যার সমাধান করতে পারে আর ভয় ভিকটিমে রূপান্তরিত করতে পারে-এটা মেয়েদের মনে রাখতে হবে।

আমাদের সমাজের বড় সমস্যা হল আমরা শুধু বলতে পারি কিন্তু কিছু শুনতে চাই না।আমাদের মনে রাখা উচিত যে মেয়েটি ধর্ষিত হয়েছে সে মেয়েটি তার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে।তাই তার পাশে থাকতে হবে আর সুন্দরভাবে বাঁচার সুযোগ করে দিতে হবে।আর অপরাধীর হতে হবে যথার্থ শাস্তি।সরকারকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।তবেই একটি সুন্দর ও কলুষমুক্ত দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

লেখিকা

রিচা নওশিন পিংকি

সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটি

আইন ও বিচার বিভাগ

richanawshin1@gmail.com

ব্রেকিং নিউজঃ
Widget by:Baiozid khan